ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের কাহিনি নয়, বরং একটি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক এবং বন্দিজীবনের গভীর ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মেয়োর হত্যাকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা।
লর্ড মেয়োর প্রকৃত নাম ছিল রিচার্ড সাউথওয়েল বুর্ক। তিনি ১৮৬৯ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে ব্রিটিশ সরকার ভারতের প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়েছিল ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বহু দূরে, আন্দামানের এক নির্জন দ্বীপে।
১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারি। লর্ড মেয়ো আন্দামানের বন্দিশিবির ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিদর্শনে যান। আন্দামান তখন ব্রিটিশদের জন্য ছিল একটি দণ্ড উপনিবেশ-দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত বন্দিদের পাঠানো হতো।
৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় লর্ড মেয়ো দিনের পরিদর্শন শেষে সমুদ্রতীরের দিকে ফিরছিলেন। সূর্য তখন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারপাশে সমুদ্রের নীরবতা, পাহাড়ের অন্ধকার এবং বন্দিশিবিরের কঠোর বাস্তবতা।
কেউ তখনও জানত না, ভারতের সর্বোচ্চ ব্রিটিশ শাসকের জন্য সেটিই হতে চলেছে শেষ সন্ধ্যা।
এই সময় শের আলী আফ্রিদি নামে এক বন্দি লর্ড মেয়োর ওপর আক্রমণ করে। লর্ড মেয়ো গুরুতর আহত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান।
ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য ঘটনাটি ছিল প্রচণ্ড আঘাতের। কারণ ভারতের ভাইসরয় ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতে সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি। তাঁর হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনের নিরাপত্তা ও কর্তৃত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
ব্রিটিশ সরকারি নথিতেও ১৮৭২ সালের লর্ড মেয়োর হত্যাকাণ্ডের চিকিৎসা ও প্রশাসনিক রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
শের আলী কে ছিলেন?
শের আলী ছিলেন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি। তাঁর জীবন, বিচার এবং বন্দিজীবনের নানা দিক এই হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর বেশি কোন তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পারিনি।
তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—শের আলীর কর্মকাণ্ডকে সরাসরি একটি বৃহৎ সংগঠিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর মতো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভ, বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বিরূপতা—এসব বিষয় তাঁর কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যায় আলোচিত হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি ছিল একজন বন্দির হাতে ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ শাসকের হত্যাকাণ্ড; কিন্তু এর পেছনে বৃহত্তর কোনো সংগঠিত বিদ্রোহী পরিকল্পনা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে ইতিহাসের প্রমাণকে সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা জরুরি।
লর্ড মেয়োর মৃত্যু শুধু একজন ভাইসরয়ের মৃত্যু ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অজেয়তার ধারণার ওপর একটি প্রতীকী আঘাত।
যে সাম্রাজ্য ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষকে শাসন করছিল, সেই সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিই শেষ পর্যন্ত একজন বন্দির আক্রমণে প্রাণ হারালেন।
ইতিহাস কখনো কখনো এমন নির্মম বৈপরীত্য তৈরি করে, যিনি ছিলেন সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক, তাঁর শেষ মুহূর্তটি কেটেছিল সেই সাম্রাজ্যেরই একটি বন্দিশিবিরে।
লর্ড মেয়োর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন উপলব্ধি করেছিল, বন্দুক, আইন, কারাগার ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে একটি সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অসন্তোষকে সবসময় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
আন্দামানের সেই সন্ধ্যা তাই ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে একটি গভীর প্রতীক হয়ে আছে— ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই, আর ইতিহাসের অন্ধকার প্রান্তে কখনো কখনো এমন ঘটনা জন্ম নেয়, যা পুরো সাম্রাজ্যকেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।
আজ যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছে, যারা এককভাবে এই অঞ্চলকে একটি সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা করে ভাবছে, যারা এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তাদের এই সত্য ইতিহাস জানতে হবে। ইতিহাস বিকৃত করে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে সাম্প্রদায়িক করে তোলার খেসারত একদিন তাদের দিতেই হবে। কোন ধর্মের অবমাননা করে কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
[নোটঃ লর্ড মেয়ো: National Portrait Gallery-র সংরক্ষিত ছবিটি রিচার্ড সাউথওয়েল বুর্ক, ৬ষ্ঠ আর্ল অব মেয়োর প্রতিকৃতি।]
[শের আলী আফ্রিদি: তাঁর একটি বন্দিত্বকালীন আলোকচিত্রও সংরক্ষিত আছে; Wikimedia Commons-এ সেটিকে লর্ড মেয়ো হত্যাকারী শের আলী আফ্রিদির ছবি হিসেবে নথিভুক্ত করা আছে।
Wikimedia Commons +1]
[ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী শের আলীকে ১৮৭২ সালের ১১ মার্চ ভাইপার দ্বীপে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।]
en.wikipedia.org

